জাইমা রহমান দু’চোখে স্বপ্ন যার আগামীর বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ দিন দিন গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে নারী তথা তরুণীদের নিয়ে যে ‘নতুন ভাবনা’ সামনে আসছে- তা দেশের গণতন্ত্র ও উন্নয়নের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ঠিক এমনি এক সময় তরুণ আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ জাইমা রহমান নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে যেসব বক্তব্য রাখছেন- তা নতুন করে তারুণ্যের রাজনীতির ছায়া ফেলছে। বলা চলে, রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা যখন ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে- তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানের সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে পদচারণা সত্যিই গুরুত্ববহ।

আসলে বাংলাদেশে নারীর উন্নয়ন নিয়ে নানা সময়ে অনেক অগ্রগতির কথা বলা হলেও বাস্তবতার সঙ্গে সেই দাবির ব্যাপক ফারাক এখনও বিদ্যমান। জাইমা রহমান তার সাম্প্রতিক বক্তৃতাগুলোতে সেই বাস্তবতার কথাই তুলে ধরেছেন। তিনি বাংলাদেশের নারী ও তরুণীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা এবং সঙ্গে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন এভাবে- ‘আমি আমাদের দেশের নারীদের প্রত‍্যাশা ও স্বপ্নের কথা শুনেছি, তাদের ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করেছি। আমার কাছে স্পষ্ট হয়েছে- নারীরা শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে এগোলেও সামাজিক বাধা, নিরাপত্তাহীনতা এবং মানসিক প্রতিবন্ধকতার কারণে এখনও অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছেন।’ তিনি বলেছেন, ‘আমাদের কন্যারা বাস্তব জীবনের মেয়ে, যাদের স্বপ্নও বাস্তব। তাদের চোখে জ্বলে ওঠে সফলতার প্রয়াস, কৌতূহল ও দৃঢ় সংকল্পের আলো।’ তিনি মনে করেন, একটি দেশের অগ্রগতি কখনোই সম্ভব নয় যদি সে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী-নারীরা সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলধারার বাইরে থেকে যায়। জাইমা রহমানের প্রশ্ন, ‘আমরা যদি আমাদের কন্যাদের নিরাপত্তা দিতে এবং তাদের স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়িত করতে বারবার ব্যর্থ হই, তবে বাংলাদেশ কীভাবে এগোবে’?

জাইমা রহমানের এই মন্তব্যের আলোকে আমরা বলতে পারি, বাংলাদেশে এখনও অনেক মেয়ে এমন পরিবেশে বড় হচ্ছে, যেখানে নিরাপত্তার চেয়ে ভয়ই খুব কাছের বাস্তবতা। ইউনিসেফের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৯ জনই প্রতি মাসে কোনো না কোনো ধরনের সহিংস আচরণের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে শিশুধর্ষণ ও যৌননিপীড়নের একাধিক ন্যাক্কারজনক ঘটনা গোটা দেশ ও জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে ইউনিসেফ সতর্ক করেছে যে শিশুদের বিশেষ করে কন্যাশিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার রিপোর্ট উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। কিশোরী মেয়েরাও সহিংসতার ঝুঁকির বাইরে নয়। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরী মেয়েদের ২৮ শতাংশ গত ১২ মাসে শারীরিক বা মানসিক সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে।

আমাদের আরও একটি কঠিন বাস্তবতা হলো বাল‍্যবিবাহ। বাংলাদেশে এখনও ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের প্রায় অর্ধেকের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। জাইমা রহমানও মনে করেন, আমাদের কন্যাদের সুরক্ষার বিষয়টি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এর বাস্তব অর্থ থাকতে হবে। এর অর্থ হতে হবে আমাদের কন‍্যাদের পরিপূর্ণ সুরক্ষা দেওয়া, বাল‍্যবিবাহ বন্ধ করা এবং দেশের প্রতিটি কন্যার জন্য এমন সুযোগ তৈরি করা যাতে তারা শিক্ষা নিতে পারে, বিকশিত হতে পারে, কাজ করতে পারে এবং নেতৃত্ব দিতে পারে।

বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং রাজনৈতিক নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর- সব মিলিয়ে আগামী দশক হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নারীদের বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে টেকসই উন্নয়ন অর্জন করা অসম্ভব। জাইমা রহমানও মনে করেন, নারীদের জন্য রাজনীতিতে প্রবেশের পথ আরও সহজ ও উন্মুক্ত করতে হবে। তার মতে, কেবল সংরক্ষিত আসন দিয়ে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বরং প্রয়োজন নেতৃত্ব তৈরির ধারাবাহিক ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক সহায়তা। জাইমা রহমান যে ভবিষ্যৎ কল্পনা করেন, সেখানে নারী ও তরুণরা হবে নীতি নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দু। তারা শুধু ভোটার বা কর্মী হিসেবে নয়, বরং পরিকল্পনাকারী, উদ্ভাবক এবং নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকবে।
তার স্পষ্ট উচ্চারণ- বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়বে এদেশের কন্যারাই- সেই লক্ষ্যে আমাদের কন‍্যারা যেন স্বপ্ন দেখার নিরাপত্তা পায়, জ্ঞানার্জন ও নেতৃত্বের নিরাপত্তা পায় এবং নিজের স্বকীয়তায় জীবন গড়ার ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি মনে করেন, একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী-নারীরা- সমান সুযোগ ও মর্যাদা পায়। নারীদের পিছিয়ে রেখে কোনো সমাজ টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না। তার বক্তব্যের পর্যালোচনায় আমার বিশ্লেষণ এভাবে তুলে ধরতে চাই।

নারীর অগ্রযাত্রা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব : বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে নারীর অগ্রযাত্রা দৃশ্যমান। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা খাতে নারীরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি খাত পর্যন্ত সর্বত্র নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। কিন্তু বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। এখনও অনেক নারী সামাজিক কুসংস্কার, পারিবারিক বাধা, নিরাপত্তাহীনতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে পিছিয়ে পড়ছে। গ্রাম থেকে শহর-অনেক জায়গাতেই নারীদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সীমিত। জাইমা রহমান মনে করেন, এই বাস্তবতা বদলাতে হলে কেবল নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র- সব জায়গায় নারীকে সমান মর্যাদা দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে।

তরুণীদের সামনে নতুন সম্ভাবনা : বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ। এই তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারীদের সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি। তাই তরুণীদের উন্নয়ন নিশ্চিত করা মানেই দেশের ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করা। জাইমা রহমান তরুণীদের উদ্দেশে বলেছেন, আত্মবিশ্বাসই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। শিক্ষা, দক্ষতা এবং প্রযুক্তির জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে তারা নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারে। বর্তমান বিশ্বে জ্ঞান ও উদ্ভাবনের যুগ চলছে। এই যুগে নারীরা যদি প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, উদ্যোক্তা খাত এবং নেতৃত্বের জায়গায় এগিয়ে আসে, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।


রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ : বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের উপস্থিতি থাকলেও নেতৃত্বের পর্যায়ে তাদের সংখ্যা এখনও কম। সংসদে সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে নারীরা প্রতিনিধিত্ব পেলেও বাস্তবে নীতি নির্ধারণে তাদের ভূমিকা অনেক সময় সীমিত হয়ে যায়। জাইমা রহমানও মনে করেন, নারীদের রাজনীতিতে আরও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে নারীদের নেতৃত্ব বিকাশে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা এবং নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে আরও অনেক নারী রাজনীতিতে আসতে আগ্রহী হবে। তিনি বিশ্বাস করেন, নারীর নেতৃত্ব শুধু নারী ইস্যু নয়; এটি সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয়।

সাইবার যুগে নতুন চ্যালেঞ্জ : ডিজিটাল যুগে নারীরা যেমন নতুন সুযোগ পাচ্ছে, তেমনি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখিও হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় নারীরা অপমান, কটূক্তি ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়। এই পরিস্থিতি অনেক নারীকে জনপরিসরে সক্রিয় হতে নিরুৎসাহিত করে। জাইমা রহমান মনে করেন, এই সমস্যা মোকাবিলায় আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা জরুরি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিরাপদ করতে পারলে তরুণীরা নিজেদের মতামত আরও স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারবে।
পরিবার থেকেই শুরু হোক পরিবর্তন : নারীর ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন- পরিবর্তনের শুরু পরিবার থেকেই হতে হবে। একটি মেয়ের আত্মবিশ্বাস, সাহস এবং নেতৃত্বের গুণ পরিবার থেকেই তৈরি হয়। যদি পরিবার মেয়েদের মতামতকে গুরুত্ব দেয় এবং তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দেয়, তাহলে সমাজে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। বাংলাদেশের অনেক পরিবারেই এখনও মেয়েদের চলাফেরা, শিক্ষা বা পেশা নির্বাচন নিয়ে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই মানসিকতা বদলানোই হবে নারীর অগ্রগতির প্রথম ধাপ।

নতুন প্রজন্মের রাজনীতির সম্ভাবনা : বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, তরুণদের অংশগ্রহণ ছাড়া গণতন্ত্র শক্তিশালী হতে পারে না। এই প্রেক্ষাপটে জাইমা রহমানের সক্রিয়তা অনেকের কাছে নতুন প্রজন্মের রাজনীতির প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি শিক্ষিত, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং তরুণদের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে রাজনীতিকে আরও অংশগ্রহণমূলক করার কথা বলছেন। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের নিয়ে তার বক্তব্য নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয়- যেখানে সমতা, অন্তর্ভুক্তি এবং মানবিক মূল্যবোধ গুরুত্ব পাবে।

তবে এই পথ সহজ নয়। বাংলাদেশের সমাজ এখনও অনেক ক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক। নারীদের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে অনেকেই প্রস্তুত নয়। এছাড়া নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক চাপও নারীদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবুও পরিবর্তনের ধারা থেমে থাকে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়। নতুন প্রজন্ম সেই পরিবর্তনের বাহক।

আগামীর বাংলাদেশ : জাইমা রহমান যে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কল্পনা করেন, সেখানে নারী ও পুরুষ সমানভাবে রাষ্ট্র ও সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তি, নারীদের নেতৃত্ব এবং প্রযুক্তির সম্ভাবনা মিলিয়ে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠতে পারে। এই বাংলাদেশ হবে বৈষম্যহীন, মানবিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক- যেখানে প্রত্যেক নাগরিক নিজের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে।

নারী ও তরুণদের নিয়ে জাইমা রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন আলোচনার দ্বার খুলেছে। তার বক্তব্যে যেমন রয়েছে নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের দাবি, তেমনি রয়েছে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের সম্ভাবনা। তবে এসব ধারণা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক সচেতনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। শুধু বক্তব্য নয়, নীতিগত পরিবর্তন, শিক্ষা সংস্কার এবং নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে পারলেই নারীরা সত্যিকারের ক্ষমতায়নের পথে এগোতে পারবে। আমি মনে করি, নারী ও তরুণীদের নিয়ে জাইমা রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিয়ে একটি দৃষ্টিভঙ্গি। তাই সময় এসেছে নারী ও তরুণদের শক্তিকে কাজে লাগানোর। কারণ দেশের ভবিষ্যৎ তাদের হাতেই। আর সেই সম্ভাবনার কথাই নতুনভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন জাইমা রহমান।

লেখক : ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ