কেপিসি স্কয়ার : উচ্চতার শিখরে বাঙালি

কেপিসি স্কয়ার বাঙালির গর্ব। উচ্চতার শিখরে বাঙালির অংহকার। এটি শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রকল্প নয়, এটি প্রবাসে বাঙালির স্বপ্ন, সাহস ও সাফল্যের প্রতীক। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নগরী লস অ্যান্জলসে এমন একটি আধুনিক স্থাপনা গড়ে ওঠা প্রমাণ করে যে- বাঙালিরা বিশ্বব্যাপী ব্যবসা ও উন্নয়নে পিছিয়ে নেই। বরং সমভাবে পাল্লা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এই প্রকল্প প্রবাসী উদ্যোক্তাদের মেধা, পরিশ্রম ও দূরদর্শিতার ফল। কেপিসি স্কয়ার বাঙালির আত্মবিশ্বাসকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে এবং আগামী প্রজন্মকে বড় স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। তাই এটি নিঃসন্দেহে বিশ্বমঞ্চে বাঙালির গর্বের এক উজ্জ্বল প্রতীক।

এর স্বপ্নদ্রষ্টা বাংলাদেশী আমেরিকান কালী প্রদীপ চৌধুরী। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত জনাব চৌধুরী একজন আলোকিত শিল্প-উদ্যোক্তা হিসেবে বিশ্বে পরিচিত। আমেরিকার ক্যালোফোনিয়ার লস-অ্যান্জেলসে প্রতিষ্ঠা করেছেন কেপিসি গ্রুপ অব কোম্পানিজ। রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এই গ্রুপের নানা ব্যবসা-বাণিজ্য ও কার্যক্রম।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লসএঞ্জেলস সিটি দীর্ঘদিন ধরেই বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। লস- অ্যাঞ্জেলসে এই ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলে প্রস্তাবিত একটি উন্নয়ন প্রকল্প নতুন পরিচয়ে ‘কেপিসি স্কয়ার’ নামে রূপ নিয়েছে- যার পেছনে রয়েছে কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও ব্র্যান্ডিং-সম্পর্কিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। যার উদ্যোক্তাও বাঙালি বাবু কালী প্রদীপ চৌধুরী।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, এক সময়ের চায়না ওশিনওয়াইড প্লাজা কিভাবে কেপিসি স্কয়ার হলো। তার পেছনে রয়েছে ভিন্ন এক ইতিহাস। উল্লেখ্য, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চীনের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার রয়েছে। সেই দৃষ্টিকোন থেকে লস-অ্যাঞ্জলসেও চায়না ওশিনওয়াইড প্লাজা শুরুটা দৃষ্টিনন্দন ছিল। বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক সময় চায়না ওশিনওয়াইড প্লাজা প্রকল্পটির কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। এক সময় ব্যাংক প্রকল্পটি দেউলিয়া ঘোষণা করে। নিয়মানুয়ী টেন্ডার আহ্বান করা হয়। সুনামধন্য ২৮টি কোম্পানি টেন্ডারে অংশ নেয়। শেষ হাসি হাসে কেপিসি গ্রুপ। তারপরের ইতিহাস ‘কেপিসি স্কয়ার’-এর অধ্যায়। তবে সময়ের চাহিদায় কেপিসির ঐতিহ্যগত বাণিজ্য-কাঠামোতে পরিবর্তিত আনা হয়েছে। তারপর ‘কেপিসি স্কয়ার’ নামটি সেই আধুনিক, আন্তর্জাতিক ও বহুমাত্রিক ভাবমূর্তিকে তুলে ধরার প্রচেষ্টা।

কেপিসি স্কয়ার লস এঞ্জেলেসের অন্যতম বৃহত্তম মিক্সড-ইউজ আকাশচুম্বী প্রকল্প, যেখানে আবাসিক, হোটেল ও বাণিজ্যিক পরিকাঠামো একত্রে ডিজাইন করা। কেপিসি স্কয়ারে আছে, আধুনিক আবাসিক ইউনিট, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল সুবিধা, রিটেইল ও বিনোদন কেন্দ্র, উন্মুক্ত পাবলিক স্পেস। এই পুনর্গঠন কৌশল লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের সেভেন স্ট্রিট অঞ্চলের পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি Staples Center / Crypto.com Arena, Los Angeles Convention Center এবং L.A. LIVE এর ঠিক বিপরীতে অবস্থিত।

প্রজেক্ট আকার ও কাঠামো: মোট ৪.৬ একর ভূমিতে তিনটি উচ্চ-এস্তিম ব্যাপক টাওয়ার। টাওয়ার ১: ৪৯ তলা, উচ্চতা প্রায় ২০৬ মিটার (৬৭৭ ফিট)- এতে ১৮৪টি রুমের Park Hyatt পাঁচ-তারা হোটেল ও ১৬৪টি ব্র্যান্ডড কন্ডোমিনিয়াম পরিকল্পিত ছিল। টাওয়ার ২ ও ৩: প্রতিটি প্রায় ৪০ তলা, মোট ৫০৪টি আবাসিক ইউনিট ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনটি টাওয়ার একটি বৃহৎ পডিয়াম বা প্লাজার উপর দাঁড়াবে, যার নিচে ১৬৬,০০০ বর্গফুট বাণিজ্যিক/রিটেইল জায়গা ও উপরের তলায় ২ একর অ্যামেনিটি ডেক পরিকল্পিত। ইনফ্রাস্ট্রাকচার উপাদান: ইটালিক করা অংশ – মাটির ভরের জন্য একটি বিশাল কংক্রিট পোর করা হয়েছিল যা প্রায় ২৬,০০০+ ঘন-ইউনের কংক্রিট ও ৬ মিলিয়ন পাউন্ড রিবার ব্যবহার করে নির্মাণকাজ শুরু হয়। পুরো কমপ্লেক্সে কার পর্কিং, রিটেইল গ্যালারিয়া, অ্যামেনিটি স্পেস, লিভিং অ্যাশিয়াদি অন্তর্ভুক্ত হতো। এছাড়া কোচেলা সিটিতে ৩২ হাজার বাড়ি তৈরি হচ্ছে ইনভেস্টমেন্টদের সেকেন্ড হোম হিসেবে আকর্ষনীয় হতে পারে। এর বিস্তারিত জানতে উইকিপিডিয়া ও গুগল ভিজিট করতে পারেন ।

এখানে কেপিসি গ্রুপের বিনিয়োগ আকর্ষণের কৌশলগত দিক রয়েছে। একটি নতুন নাম ও স্বতন্ত্র ব্র্যান্ডিং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রকল্পটিকে আলাদা করে উপস্থাপন করতে সাহায্য করে। ‘স্কয়ার’শব্দটি বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স, অফিস স্পেস, রিটেইল আউটলেট ও কমিউনিটি স্পেসের সমন্বিত ধারণা বহন করে— যা আধুনিক নগর উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে বোঝানো হচ্ছে, এটি শুধু একটি মার্কেট নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়িক ও সামাজিক কেন্দ্র।

নগর পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সম্পত্তির মূল্য বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে। আধুনিক স্থাপত্য, পার্কিং সুবিধা, প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পরিবেশবান্ধব নকশা যুক্ত করে প্রকল্পটিকে ভবিষ্যতমুখী করা হচ্ছে। পুরোনো ওশিনওয়াইড প্লাজার ইমেজের বাইরে গিয়ে এটি একটি সমসাময়িক বাণিজ্যিক হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ্যেই নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। বলা যায়, ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখেই একটি আধুনিক, বহুমাত্রিক ও আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্দেশ্যেই প্রকল্পটি ‘কেপিসি স্কয়ার’ নামে আত্মপ্রকাশ করছে। এটি কেবল নাম পরিবর্তন নয়; বরং একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, বিস্তৃত বাজার কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রতিফলন।

প্রবাসী কালী প্রদীপ চৌধুরীর নিজ জন্মস্থান বাংলাদেশের সিলেট জেলায়। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী অবস্থান হলেও দেশের মানুষকে নিয়েও স্বপ্ন দেখেন তিনি। তার স্বপ্ন বাংলাদেশ হোক আত্মনির্ভর, বিনিয়োগবান্ধব। দীর্ঘদিন বিদেশে ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উপলব্ধি করেছেন- বাংলাদেশ হওয়া উচিত প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর দেশ। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স প্রেরণকারী নন; তারা হতে পারেন দেশের উন্নয়নের কৌশলগত অংশীদার। তাই প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ প্রক্রিয়া, এক-স্টপ সার্ভিস, কর-সুবিধা এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি চান, বাংলাদেশে এমন একটি ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে উঠুক যেখানে বিদেশ ফেরত উদ্যোক্তারা আস্থার সঙ্গে শিল্প-কারখানা, আইটি, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন।

কালী প্রদীপ চৌধুরীর স্বপ্ন একটি সমন্বিত উন্নয়নের বাংলাদেশ— যেখানে প্রবাসী ও দেশীয় নাগরিক একসঙ্গে কাজ করে একটি সমৃদ্ধ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র গড়ে তুলবে। তার বিশ্বাস, সঠিক নীতি, সৎ নেতৃত্ব ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ বিশ্বমানের অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে সক্ষম। সেই লক্ষ্যে বিগত সরকারের সময়ে পূর্বাচল নিউ টাউন এলাকায় ১৪২ তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ব্যাপক আলোচনায় আসে। মালয়েশিয়ায় টুইন টাওয়ারের আদলে ১৪২ তলা কেপিসির আইকন টাওয়ার। ভবনটি নির্মাণে কালী প্রদীপ চৌধুরী তার স্বপ্নপূরণে বাংলাদেশে মোট ২৯ বার এসেছিলেন। কথা বলেছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ,অর্থমন্ত্রী, রাজউক চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে। উচ্চতর ভবন নির্মাণে কারিগরি ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে সরকারকে সকল ধরনের সহযোগিতার বিষয়টিও স্পষ্ট ছিল। বলা হয় শক্তিশালী ভূ-প্রকৌশল বিশ্লেষণ, গভীর পাইলিং, উন্নত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত সড়ক-যোগাযোগ সুবিধা কথাও। সে সময় নানা আশ্বাসের পরও বাস্তবতা হচ্ছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন মিলেনি। কেপিসি গ্রুপের পক্ষ থেকে শত চেষ্টা থাকলেও প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত সরকারের সারা মিলেনি। কেপিসি গ্রুপ পূর্বাচলে ১৪২ তলা ভবন বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে অনেকেই তৎকালীন সরকারের অসহযোগিতার কথা বলেন।ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাওয়ার সেই চাপা কষ্ট এখনও ধারণ করছেন কালী প্রদীপ চৌধুরী।

বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার এখন ক্ষমতায়? এখন কি সেই উদ্যোগের কথা ভাবছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে বিজনেস আমেরিকাকে কালী প্রদীপ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ সম্ভাবনাময় অর্থনীতির আধার। দেশটি আমার জন্মভূমি। এখানে সরকারের যে কোন প্রকল্পে যুক্ত থাকা সুভাগ্যের।

আমরা চাই, পুর্বাচল নিউ টাউনে ১৪২ তলা কেপিসি ‘আইকন’ টাওয়া পুনর্বিবেচনায় আনা হোক। কারণ এটি কেবল একটি উচ্চ ভবনের স্বপ্ন নয়, এটি একটি আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের প্রতীক হওয়ার প্রত্যাশা। রাজধানী ঢাকার পাশেই পরিকল্পিত নতুন নগরী পূর্বাচল নতুন শহর ইতোমধ্যে আধুনিক অবকাঠামো, প্রশস্ত সড়ক ও উন্নত নাগরিক সুবিধার জন্য পরিচিত। এই পূর্বাচলেই যদি আন্তর্জাতিক মানের ১৪২ তলা কেপিসি টাওয়ার নির্মিত হয়, তবে তা হবে দেশের স্থাপত্য ইতিহাসে এক মাইলফলক।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুউচ্চ ভবন কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র নয়, বরং জাতীয় সক্ষমতার প্রতীক। যেমন দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বিশ্বমানচিত্রে নতুন পরিচিতি দিয়েছে। তেমনি পূর্বাচলে একটি আইকনিক টাওয়ার বাংলাদেশকে বিনিয়োগ, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

১৪২ তলা কেপিসি টাওয়ারে থাকতে পারে করপোরেট অফিস, পাঁচতারকা হোটেল, শপিং মল, কনভেনশন সেন্টার, পর্যটন ভিউ ডেক এবং আধুনিক আবাসিক সুবিধা। এতে সৃষ্টি হবে হাজার হাজার কর্মসংস্থান। নির্মাণ পর্যায় থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্যন্ত দেশীয় প্রকৌশলী, স্থপতি ও দক্ষ শ্রমিকদের জন্য উন্মুক্ত হবে নতুন সম্ভাবনা। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও এটি হবে আস্থার প্রতীক।
তবে এমন স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, শক্তিশালী অর্থায়ন ও সর্বোচ্চ মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ভূমিকম্পপ্রবণ দেশে সুউচ্চ ভবন নির্মাণে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা অত্যাবশ্যক। টেকসই নির্মাণ প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি ব্যবহার এবং আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে শুরু থেকেই।

আমরা উন্নয়নের প্রতীক চাই, বিনিয়োগের কেন্দ্র চাই, নতুন প্রজন্মের স্বপ্নের ঠিকানা চাই। সঠিক পরিকল্পনা ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই স্বপ্ন একদিন বাস্তবে রূপ নিক- এটাই প্রত্যাশা। আশা করি, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার বিষয়টি বিবেচনায় রাখবেন।

 

লেখক : এনামুল হক এনাম, সম্পাদক, বিজনেস আমেরিকা ও অর্থকন্ঠ