বিএনপির জন্ম এবং বাংলাদেশের বহু দলীয় গণতন্ত্র

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জেনারেল জিয়াউর রহমান বহু দলীয় গণতন্ত্রের স্রষ্টা হিসাবে খ্যাত এবং স্মরণীয়। তিনি কেবল বহুদলীয় গণতন্ত্রই প্রতিষ্ঠা করেননি, বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি রাজনৈতিক দর্শন উপহার দিয়েছেন। সেই দর্শনের ভিত্তিতে একটি কর্মসূচি প্রণয়ন করেন এবং সেই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য গড়ে তোলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির প্রতিষ্ঠাতা তিনি। দলের লক্ষ্য সম্পর্কে জিয়াউর রহমান নিজেই লিখেছেন- ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দর্শন শত শত বর্ষ ধরে এদেশের আপামর জনগণের অন্তরে চির জাগরুক রয়েছে। যুগ যুগান্তরের দেশপ্রেমিকদের হৃদয়ের মর্মমূলে নিহিত তাদের সর্বোৎসাহ, উদ্যোগ ও প্রেরণার উৎস এই দর্শন। এই দর্শনে নিহিত রয়েছে বাস্তব আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক কর্মসূচি যা দেশের ঐক্যবদ্ধ জনগণকে সমকালীন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে উপযোগী, বাস্তবমুখী ও সময়োচিত শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়নে উদ্বুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুসংবদ্ধ করবে, জাতিকে সুনিশ্চিতভাবে অগ্রগতির ও সমৃদ্ধির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেবে এবং বিশ্ব জাতির দরবারে বাংলাদেশকে মর্যাদা ও গুরুত্বের আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করবে।’ শুধু তাই নয়, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মূল লক্ষ্য শনাক্ত করছেন তিনি এভাবে : ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে একটি শোষণমুক্ত সমাজ, যা অত্যন্ত বাস্তব ও প্রগতিশীল একটি সমাজ, যাতে থাকবে সমতা, নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচার।’

জেনারেল জিয়াউর রহমান কেন বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন? দল না করেই তো সামরিক শাসন দিয়ে সরকার চালাতে পারতেন- এমন কথাও কেউ কেউ বলে থাকেন। আসলে তিনি ছিলেন খাঁটি দেশপ্রেমিক এবং গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বঙ্গভবনে রাজনীতিবিদদের গোলটেবিল আলোচনায় এবং পরবর্তী সময়ে আরও অনেকবার তিনি বলেছেন, ‘সামরিক শাসন স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা হতে পারে না। তাই যত দ্রুত সম্ভব আমাদের গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।’ তিনি কথা রেখেছিলেন। তার হাত ধরেই দেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছিল। তার হাত ধরেই বিএনপি এখন দেশের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। তার গণমুখী রাজনীতি সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। তার ১৯ দফা কর্মসূচিতে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের যে দিকনির্দেশনা রয়েছে, তা জনগণ সর্বাত্মকভাবে গ্রহণ ও সমর্থন করেছে। যে কারণে দলটি আজ জনগণের দলে পরিণত হয়েছে। বহুবার দলটিকে ভেঙে টুকরো টুকরো করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সফল হয়নি। স্বৈরশাসক এরশাদ, ওয়ান-ইলেভেনের কুচক্রীরা এবং গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে সে চেষ্টাও অব্যাহত ছিল। নানারকম প্রলোভন দেখিয়েও নেতাকর্মীদের আলাদা করতে পারেনি।

এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিএনপির জন্ম হয়েছিল। ১৯৭৫-এর পর দেশের রাজনীতিতে যে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয় তা পূরণ করতে রাষ্ট্র পরিচালনার পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান। এক বছরের মাথায় তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। সরকারপ্রধান হয়ে তিনি পুনরায় দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিস্থাপন ও জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়ার কথা বলেন। তখন দেশবাসী এটা ভেবে স্বস্তি অনুভব করল যে, বাংলাদেশের নেতৃত্বশূন্যতার অবসান হতে চলেছে। ১৯৭৬ সালের জুন মানে দেশে সীমিত আকারে রাজনৈতিক তৎপরতা চালুর জন্য ‘ঘরোয়া রাজনীতি’র অনুমতি দেওয়া হয়। ১৯৭৭ সালের শুরুতে ‘উন্নয়ন-উৎপাদনের ১৯ দফা’ কর্মসূচির ঘোষণা এবং সে কর্মসূচির প্রতি জনসমর্থন যাচাইয়ের জন্য গণভোটের আয়োজন ছিল রাজনীতিশূন্য বাংলাদেশে প্রথম রাজনৈতিক আয়োজন। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে অনুষ্ঠিত গণভোটে বাংলাদেশের মানুষ সমর্থন দেয় রাষ্ট্রপতি জিয়ার প্রতি। তারপর তিনি দেশে পুরোপুরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালুর উদ্যোগ নেন। ডিসেম্বর মাসেই বঙ্গভবনে দেশের সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের এক গোলটেবিল বৈঠক ডাকেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সে বৈঠকে ন্যাপ (ভাসানী), আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, ইউপিপি, ডেমোক্রেটিক লীগ, ন্যাপ (মোজাফ্ফর)সহ সব রাজনৈতিক দলই অংশ নেয়। বৈঠকে দেশে কীভাবে গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটানো যায়, তা নিয়ে সবাই খোলামেলা বক্তব্য দেন।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। ওইদিন রাজধানীর রমনা রেস্তোরাঁয় এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপির আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দেন। প্রথমে দলের ১৮ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেন তিনি। সে কমিটির চেয়ারম্যান প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিজে। মহাসচিব ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। ১৯ সেপ্টেম্বর আগের ১৮ জনসহ ৭৬ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের পর দেশের সর্বত্র শাখা কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দ্রুতগতিতে সেটা সম্পন্ন হয়। জিয়াউর রহমানের সততা ও দেশপ্রেমের কথা তখন জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচারিত। একজন সৎ ও দেশপ্রেমিক নেতার দলে যোগ দিতে সবার আগ্রহী হওয়াটা ছিল স্বাভাবিক। ফলে দেশব্যাপী নতুন দল বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দ্রুত বিস্তার লাভ করে।
তারপর আসে দেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সে নির্বাচনে নবগঠিত দল বিএনপি ২৯৮টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতে বিজয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগ ৩৯টি আসন পেয়ে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের বেঞ্চে বসে। ওই নির্বাচনে বিএনপির সে ভূমিধস বিজয়ের পেছনে রাষ্ট্রপতি জিয়ার ইমেজই প্রধান ভূমিকা রাখে।

বিএনপির ওপর চরম আঘাত আসে ১৯৮১ সালের ৩০ মে। ওইদিন চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে সশস্ত্র বাহিনীর কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল সদস্যের হাতে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। শোকাতুর হয়ে পড়ে গোটা জাতি। অনেকেরই সংশয় ছিল, জিয়ার অবর্তমানে বিএনপি টিকে থাকবে কি না। কিন্তু সেসব সংশয় মিথ্যে প্রমাণ করে বিএনপি টিকে আছে এবং নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবর্তন করেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক প্লাটফর্মে থেকে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তিনি এদেশের মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবোধ জাগানোর প্রয়াস চালান। অনেকটা সফলও হন তিনি। আজ এ জাতীয়তাবাদী দর্শনই একটি জাতি ও দেশের রক্ষাকবচ।

আমার রাজনৈতিক আদর্শ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। আমি বিএনপির বর্তমান চেয়ারপারসন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বের আস্থায় একজন সাধারণ কর্মী। আমার রাজনৈতিক গুরু বাংলাদেশের গণমানুষের নেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তার সুযোগ্য সন্তান দাউদকান্দি ও তিতাসের মাটি-মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক ব্যারিস্টার খন্দকার মারুফ হোসেনের পাশে থেকে বিএনপির একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করে আসছি। আমি আমৃত্যু জাতীয়তাবাদী চেতনায় জাগ্রত থাকতে সকলের সহযোগিতা চাই। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সকলের প্রতি আমার প্রাণঢালা ভালোবাসা।

লেখক : রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও ব্যবসায়ী