রঙ-তুলি আর পদকের ঝিলিক

বিকেল গড়িয়ে যখন তিনটা। গ্রীন স্কয়ার ক্যাম্পাসের নূর স্কয়ারের সামনে তখন ছোট ছোট পায়ের দৌড়ঝাঁপ। কারও হাতে রঙের বাক্স। কারও কাঁধে স্কেচবোর্ড। কেউ আবার নতুন জামার হাতা টেনে বলে উঠছে, ‘আমি ম্যাডেল পাব তো?’-এই এক প্রশ্নে জমে উঠেছিল সেরোভ একাডেমি অফ ফাইন আর্টসের বার্ষিক অনুষ্ঠান।

গতকাল শনিবার সেরোভ একাডেমি অফ ফাইন আর্টস অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ এবং পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান আয়োজন করে। আয়োজনটি ছিল গ্রীন স্কয়ার ক্যাম্পাসে। তবে একযোগে গ্রীন স্কয়ার ক্যাম্পাস ও ধানমন্ডির রাশিয়ান হাউস ইন ঢাকা-দুই ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের ফলাফলও ঘোষণা করা হয়।

ফলাফল প্রকাশ-শুনতে যতটা আনুষ্ঠানিক, বাস্তবে অনুষ্ঠানটা ছিল ঠিক তার উল্টো-প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বাসে ভরা। কারও চোখে উত্তেজনা, কারও চোখে একটু কৌতূহল-ফলাফল ঘোষণার মুহূর্তে এই দুই অনুভূতিই যেন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল।

ফলাফল ঘোষণার পরপরই নাম ধরে ডাকা শুরু হয়। ছোট্ট হাতে যখন সনদ আর বিশেষ পুরস্কার তুলে দেওয়া হচ্ছিল, তখনই ক্যাম্পাসজুড়ে উঠছিল করতালি। কেউ ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও করছে, কেউ আবার এক কোণে দাঁড়িয়ে সন্তানের আঁকা ছবি দেখিয়ে বলছে, “ওর এই ছবিটা গত সপ্তাহে শেষ করেছে!”

অনুষ্ঠানের বিশেষ দিক ছিল-সব শিক্ষার্থীকে বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। আয়োজকদের ভাষায়, শিল্পচর্চায় সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো ধারাবাহিকতা। আর সেই ধারাবাহিকতাকেই স্বীকৃতি দিতে চেয়েছে একাডেমি।

আর যারা ফলাফলে এগিয়ে, তাদের জন্য ছিল আলাদা সম্মান-সেরাদের গলায় পরানো হয় ম্যাডেল। পদক পরার পর এক ক্ষুদে শিক্ষার্থী বারবার হাত দিয়ে গলায় ঝুলে থাকা ম্যাডেলটা ছুঁয়ে দেখছিল-যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না, এই ঝিলিকটা সত্যি তার!

অনুষ্ঠানজুড়ে বারবার মনে হয়েছে-এটা শুধু একটি ফলাফল প্রকাশ নয়, এটা একেকটা শিশুর পরিশ্রমের গল্প। কারও আঁকা প্রথম সোজা লাইন, কারও প্রথম শেডিং, কারও প্রথম পোর্ট্রেট-সব মিলিয়ে বছরজুড়ে যে শেখা, তারই উৎসবমুখর সমাপ্তি।

এক অভিভাবক বললেন, ‌“ও আগে মোবাইলে গেম খেলত বেশি। এখন বাসায় এসে বলে, ‘আমাকে কাগজ দাও, আমি আঁকব।’ এই পরিবর্তনটাই আমাদের কাছে বড়।”

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে যখন অনুষ্ঠান শেষ, তখনও ক্যাম্পাস ফাঁকা হচ্ছিল না। কেউ পুরস্কার হাতে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলছে, কেউ শিক্ষকের কাছে গিয়ে মাথা নেড়ে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে, কেউ আবার পরের ক্লাস কবে-সেই হিসাব কষছে।

অনুষ্ঠান শেষে একাডেমির পরিচালক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানান এবং বলেন, শিল্পচর্চা কেবল হাতের কাজ নয়-এটা মনকে শৃঙ্খলিত করে, চোখকে সংবেদনশীল করে, আর মানুষকে আরও মানবিক করে তোলে।

শেষ পর্যন্ত দিনটা রয়ে গেল রঙের মতোই-উজ্জ্বল। গ্রীন স্কয়ারের বিকেলে ক্ষুদে পদচারণা আর করতালির শব্দ মিলে তৈরি করল এক আনন্দমুখর স্মৃতি। এটির কেন্দ্রে ছিল ছোট ছোট স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখার প্রথম স্বীকৃতি। একটি সনদ, একটি পুরস্কার, আর কারও কারও জন্য-একটি ঝলমলে ম্যাডেল।

মাতৃস্নেহে শিক্ষক-শিক্ষিকারা বাচ্চাদের হাতে-কলমে আঁকা, রং করা ও সৃজনশীলতার পাঠ দেন। সেরোভ একাডেমির পরিবেশ পরিপাটি ও মনোরম-ক্লাসরুমগুলো পরিচ্ছন্ন, সাজানো-গোছানো এবং শিশুবান্ধব। এখানে শেখার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের আত্মবিশ্বাসও বাড়ে। নিরাপদ ও আনন্দঘন এই পরিমণ্ডল শিল্পচর্চাকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত।