বিজয় দিবস কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি চেতনার নাম। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের ইতিহাসে যেমন রক্ত, ত্যাগ ও আত্মমর্যাদার প্রতীক তেমনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দিনটি নতুন নতুন অর্থ ধারণ করেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দাঁড়িয়ে আজ যখন আমরা বিজয় দিবসকে দেখি, তখন প্রশ্ন জাগে- এই বিজয় দিবস কি কেবল ১৯৭১-এর স্মৃতি, নাকি এটি একটি চলমান সংগ্রামের ধারাবাহিকতা।
১৯৭১ সালে বিজয় এসেছিল এক দুঃসহ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। অস্ত্রের মুখে, বধ্যভূমির রক্তে, শরণার্থীর কান্নায় গড়ে উঠেছিল স্বাধীনতা। সেই বিজয় আমাদের একটি রাষ্ট্র দিল, একটি পতাকা দিল, একটি সংবিধানের স্বপ্ন দেখাল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল- রাষ্ট্র পেলেও গণতন্ত্র সব সময় প্রতিষ্ঠিত থাকে না; স্বাধীনতা অর্জিত হলেও নাগরিক অধিকার বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান একটি ঐতিহাসিক বাঁকবদল হিসেবে হাজির হয়।
২৪-এর গণঅভ্যুত্থান হয়তো ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা ও অবদমনের বিস্ফোরণ। ভোটাধিকার সংকুচিত হওয়া, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা, প্রশাসনিক জবাবদিহির অভাব, অর্থনৈতিক বৈষম্য- সব মিলিয়ে সমাজে এক ধরনের চাপা অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। ছাত্রসমাজ, তরুণ প্রজন্ম, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ একত্রে যখন রাস্তায় নামল, তখন সেটি কেবল সরকার পরিবর্তনের দাবি নয়; এটি ছিল রাষ্ট্রের চরিত্র বদলের আকাঙ্ক্ষা। আগে বিজয় মানে ছিল দখলদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের পরাজয়; এখন বিজয় মানে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার বিরুদ্ধে নাগরিক শক্তির জয়। ১৯৭১ আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে অস্ত্র হাতে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে হয়; ২০২৪ আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে সংগঠিত জনশক্তি দিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধার করতে হয়। আমি মনে করি, এই দুই বিজয় পরস্পরের বিরোধী নয়-বরং একে অন্যের পরিপূরক। যেমনটি ছিল ১৯৯০, ১৯৯৬, ২০০৬-২০০৭ সালের প্রেক্ষাপট। এসব আন্দোলন-অভ্যুত্থান আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়- আমরা কি সত্যিই মুক্ত? আমাদের ভোট কি অবাধ? আমাদের আদালত, প্রশাসন ও গণমাধ্যম কি স্বাধীন? বিজয় দিবসের পতাকার রঙ তখনই অর্থবহ হয়, যখন নাগরিক জীবনে তার প্রতিফলন ঘটে। বিজয় দিবস তাই এখন তরুণদের কাছে কেবল ইতিহাসের পাঠ নয়; এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের অনুপ্রেরণা। তারা বুঝেছে- স্বাধীনতা একবার অর্জন করলে তা চিরস্থায়ী হয় না; প্রতিদিনই তাকে রক্ষা করতে হয়। বিজয় দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়- এই ঐক্য ভাঙলে বিজয়ও দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, থাকবে বিতর্ক; কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক প্রশ্নে ঐক্যই শক্তি।
এই বিজয় দিবসে শুধু অতীতের বীরদের শ্রদ্ধা নয়, ভবিষ্যতের প্রতি অঙ্গীকার জরুরি। অঙ্গীকার-আমরা এমন বাংলাদেশ গড়ব, যেখানে ক্ষমতা জনগণের, আইন সবার জন্য সমান, আর স্বাধীনতা কেবল স্মৃতির পাতায় নয়-নাগরিক জীবনের বাস্তবতায় প্রতিদিনের সত্য। তখনই ১৬ ডিসেম্বর সত্যিকার অর্থে বিজয়ের দিন হয়ে উঠবে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। এই ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের সম্পত্তি নয়, এটি পুরো জাতির অর্জন। আমরা মনে করি, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান সেই ইতিহাসকে অস্বীকার করার জন্য নয়; বরং তার অসম্পূর্ণ স্বপ্নগুলোকে নতুন করে সামনে আনার প্রয়াস হতে পারে। অপ্রিয় হলেও বলতে হয়, সাম্প্রতিক সময়ে এমন কিছু বক্তব্য ও কারও স্বউদ্যোগের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে- যা ২৪-এর উচ্ছ্বাসে ৭১-এর গুরুত্বকে খাটো করে দেখাতে চায়। তাদের একটা বিরাট অংশ তারুণ্যদীপ্ত। এটি উদ্বেগজনক, কারণ ২৪ যদি ৭১-কে অস্বীকার করে, তবে তা নিজের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। আমরা মনে করি, বিশ্বাস করি ৭১ আর ১৬ ডিসেম্বর আমাদের লাখো শহীদের আত্মাহুতি, লাখো মা-বোনের সম্ভ্রম আর আত্মত্যাগ যেখানে খুঁজে পাওয়া যায় বাঙালির অস্তিস্ত্ব।
৭১ আমাদের রাষ্ট্র দিয়েছে, স্বাধীনতার মানচিত্র দিয়েছে, দিয়েছে একটি সবুজের মাঠে রক্তেদাগা একটি পতাকা। তবে রাষ্ট্র থাকলেই স্বাধীনতা পূর্ণ হয় না, যদি গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত না থাকে। আমরা মনে করি, ৭১-কে অস্বীকার করলে ২৪ তার নৈতিক শক্তি হারাবে। কারণ এই আন্দোলনের ভাষা, সাহস ও আত্মত্যাগের প্রেরণা এসেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকেই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, ভয় উপেক্ষা করে রাজপথে নামা-এসব আমাদের জাতীয় চরিত্রে এসেছে ৭১ থেকেই। তাই ২৪-কে যদি আমরা নতুন কোনো বিচ্ছিন্ন অধ্যায় হিসেবে দাঁড় করাই- তবে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ভেঙে যাবে। যার পরিণতি হয়তো আবারও পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ হতে পারে।
৭১ স্মৃতির, ২৪ দায়িত্বের। স্মৃতি ছাড়া দায়িত্ব অন্ধ, আর দায়িত্ব ছাড়া স্মৃতি নিষ্প্রাণ। তাই এই দুইকে মুখোমুখি দাঁড় করানো নয়, পাশাপাশি রাখাই জাতির জন্য মঙ্গল। নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে- মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা যেমন জরুরি, তেমনি গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামে সক্রিয় থাকাও প্রয়োজন। আর ২৪ তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা ৭১-এর অসমাপ্ত স্বপ্ন- ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বাস্তবায়ন। একজন প্রবীণ দেশপ্রেমিক হিসেবে আমি বলতে চাই, ২৪ যেন কোনোভাবেই ৭১-কে অস্বীকার না করে।
আমি এই বিজয় দিবসে গভীর শ্রদ্ধা জানাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে যারা অবদান রেখেছেন এবং আত্মত্যাগ করেছেন তাদের সকলকে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার লড়াই নয়, ছিল একটি জাতির অস্তিত্ব, ভাষা, সংস্কৃতি ও মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম। এই সংগ্রামে শহীদ হয়েছেন লাখো মানুষ, সম্ভ্রম হারিয়েছেন অসংখ্য মা-বোন, নিঃস্ব হয়েছেন অগণিত পরিবার-তবু মাথা নত করেনি বাঙালি জাতি।
বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন শত্রুর বিরুদ্ধে। তাদের সাহস, দেশপ্রেম ও ত্যাগের কারণেই লাল-সবুজের পতাকা আজ স্বাধীন আকাশে উড়ছে। পাশাপাশি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবীরা তাদের মেধা ও চিন্তার আলো দিয়ে জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন; তাদের আত্মত্যাগ আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। রাজনৈতিক নেতা, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, নারী-সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই অর্জিত হয়েছে এই বিজয়।
বিজয় দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা চিরস্থায়ী নয় যদি আমরা এর মূল্য না দিই। শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে আমাদের হতে হবে ন্যায়নিষ্ঠ, মানবিক ও দেশপ্রেমিক। বিভেদ নয়, ঐক্যের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক বিজয় দিবসে আমাদের অঙ্গীকার।





