ঠাকুরগাঁও মুক্ত দিবস: ‘৭১ মুক্তির প্রতীক আর ’২৪ ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম

আজ ৩ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁও মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী জনগণের প্রতিরোধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরাজিত হয় এবং ঠাকুরগাঁও হানাদারমুক্ত হয়। ঠাকুরগাঁও বাংলাদেশের উত্তরের স্নিগ্ধ জনপদ, স্বজনবিচ্ছিন্ন অগণিত বেদনার ইতিহাস ও বিজয়ের স্মৃতি নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে গর্বে।

১৯৭১ সালের নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মুক্তির দুরন্ত সাহসী লড়াই। আর ২০২৪ সাল বলতেই স্মরণ করি নতুন প্রজন্মের ছাত্র-যুবকদের রাস্তায় উত্তাল গণঅভ্যুত্থান, অন্যায়ের প্রতিবাদে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ বাংলাদেশকে। এই দুই সময় ১৯৭১ ও ২০২৪ আলাদা হলেও এক সুতায় বাঁধা স্বাধীনতা, অধিকার ও ন্যায়ের পক্ষে সংগ্রাম।

ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি শুরু হয় মার্চের রক্তাক্ত দিনগুলোতে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের ভয়াবহতা ঢাকায় শুরু হলেও তার প্রতিধ্বনি পৌঁছে যায় উত্তরের এই শহরে। তখনি শুরু হয় সংগঠিত প্রতিরোধ- ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযোদ্ধারা গড়ে তোলে স্থানীয় সংগঠন, যাদের অনেকেই ছিলেন ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, সরকারি কর্মচারী, কিংবা সাধারণ দিনমজুর। বাঙালির স্বাধীনতার স্পৃহা তখন ছড়িয়ে পড়ে মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কেউ ছিলেন গোপন বার্তা বাহক, কেউ আবার সরাসরি যোদ্ধা- আবার কেউ ছিলেন খাদ্য ও আশ্রয় দিয়ে সহযোদ্ধাদের নীরব শক্তি।

ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের ঐক্য। ভারতীয় সীমান্তের নৈকট্য এই অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের সরাসরি সাহায্য দেয় প্রশিক্ষণ, অস্ত্র এবং আশ্রয়ের ক্ষেত্রে। অনেক বীর ঠাকুরগাঁও থেকে ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে ফিরে আসেন- আর সেই প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধারা পরবর্তীতে শুরু করেন পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ গেরিলা আক্রমণ।

শহরের মানুষ তখন ছিল দুই ভয়ংকর বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে পাকিস্তানি সেনাদের নির্মমতা, অন্যদিকে সহযোগী রাজাকার ও আলবদরদের বিশ্বাসঘাতকতা। অনেক বাড়িতে চলেছে লুট, সংঘটিত হয়েছে নির্যাতন, আর রাতের আঁধারে গুলিতে চলে গেছে কত নিরীহ মানুষের প্রাণ। কিন্তু ভয় কেবল দমাতে পারেনি ঠাকুরগাঁওবাসীর সংগ্রামী মনোবল- বরং সেই ভয়ই জন্ম দিয়েছে প্রতিশোধের শপথ।

একটি সময় ছিল যখন ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রামগুলোতেই হয়ে উঠেছিল মিনি শরণার্থী শিবির, যুদ্ধ প্রস্তুতির ঘাঁটি। নারীরা রান্না করেছেন যোদ্ধাদের জন্য, কিছু তাঁতবুনন করা কাপড় গেরিলা পোশাক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, গ্রামের উঠোনে চলছিল গোপন বৈঠক। তখন এলাকার শিক্ষিত তরুণেরা কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করতেন। রাজনৈতিক ও নৈতিক দিকনির্দেশনা দিতেন বয়স্ক অভিজ্ঞ মানুষ আর নারীরা শক্ত হয়ে দাঁড়াতেন পরিবার ও সমাজের দৃঢ়তায়।মুক্তিযুদ্ধের সময় ঠাকুরগাঁওয়ের সীমান্তের ওপারে আশ্রয় পাওয়া, সেখানে সহায়তা ও প্রশিক্ষণ লাভ করা এবং পরবর্তীতে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে আসা- ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বহুগুণে বৃদ্ধি করে। অনেকেই বীরের মতো ফিরে এসে পাকিস্তানি বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত করতে থাকেন, শত্রুপক্ষের ঘাঁটি আক্রমণ করেন, আর ঠাকুরগাঁও শহরে প্রবেশ করার পথ ক্রমেই সংকীর্ণ করে দেন পাকিস্তানি সৈন্যদের জন্য।

বিজয়ের সময় ঘনিয়ে এলে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে বিশেষ ভূমিকা রাখে। পাকিস্তানি বাহিনী যখন আত্মসমর্পণের পথে, তখন ঠাকুরগাঁও জনপদের মানুষ সে আনন্দের উত্তাল মুহূর্ত দেখেছেন নিজেদের চোখে। ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ ঠাকুরগাঁও মুক্ত হয়। লাল-সবুজ পতাকা উড়তে থাকে আকাশে। মানুষ ছুটে যায় রাস্তায়, আর অশ্রু ঝরে পড়ে আনন্দ আর মুক্তির অশ্রু হয়ে।

আর ২০২৪ সালে পৃথিবীর সামনে উঠে আসে আরেক বীরত্বগাথা। এবার মুক্তিযুদ্ধ নয়, ছিল প্রতিবাদের যুদ্ধ; দেশদ্রোহী আক্রমণ নয়, ছিল প্রশাসনিক অবিচার, বৈষম্য ও অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্রদের সোচ্চার কণ্ঠ। সেই আন্দোলন ছাত্রদের আর্তনাদ নয়- এটি ছিল গণজাগরণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে গ্রামগঞ্জের তরুণ- সকলেই জেগে ওঠে। যেভাবে ’৭১ সালে তরুণরা এগিয়েছিল গণ–স্বাধীনতার জন্য। ২০২৪ সালের তরুণেরা এগিয়েছে গণমানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্র-শাসনে জনগণের মর্যাদার দাবিতে।এই দুই সময়ের লড়াইয়ে একটি মৌলিক মিল রয়েছে-উভয় ক্ষেত্রেই লড়াই ছিল রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ১৯৭১ সালে ঠাকুরগাঁওয়ের তরুণরা জানতো, মুক্তিযুদ্ধে হারলে বাংলা নামের একটি দেশই ইতিহাসে জন্ম নেবে না। আর ২০২৪–এর ছাত্ররা জানতো, যদি এখন নীরব থাকা হয়- তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হারাবে ন্যায়ের অধিকার, হারাবে সেই গণতান্ত্রিক শ্বাসনযন্ত্র, যা দেশের নির্মাতা প্রজন্ম রক্ত দিয়ে অর্জন করেছিলেন।

৩ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁওয় মুক্ত দিবস- এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, একটি দিগন্ত। পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেয়ার পর লাল–সবুজ পতাকা তুলে ধরতে মানুষের চোখের জল আর উল্লাস মিলেমিশে তৈরি হয় এক জাতির পুনর্জন্ম। যাদের ঘরে ফিরেনি বাবা-ভাই-স্বামী-তারা সেই দিন কাঁদলেও মাথা ছিল উঁচু। কারণ তাদের প্রিয়জন শহীদ হয়েছেন দেশের জন্য।

২০২৪ এর ছাত্ররা ঠিক এই আত্মত্যাগের ইতিহাসই স্মরণ করে আন্দোলনে দাঁড়িয়েছে। তারা হার মানেনি লাঠিচার্জে, রাবার বুলেটে, আটক-হয়রানিতে। কেউ হয়তো ভেবেছিল, তরুণরা ভয় পাবে-পিছু হটবে। কিন্তু তা হয়নি। তারা সামনে এগিয়েছে, মিছিলে, স্লোগানে, লিখিত বিবৃতিতে, ডিজিটাল–জনমতের ঢেউয়ে।

ঠাকুরগাঁওয়ের ইতিহাস আমাদের শেখায়- কোনো আন্দোলন হঠাৎ জন্ম নেয় না: তা তৈরি হয় যন্ত্রণার স্তর জমে জমে, অন্যায়ের চাপ বাড়তে বাড়তে, মানুষের আর্তি উপেক্ষিত হতে হতে। ১৯৭১ সালের সেটি ঘটেছিল পাকিস্তানি শাসনের দমন-পীড়নে, আর ২০২৪–এ ঘটেছিল দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও প্রতিনিধিত্বশূন্য ব্যবস্থায়। দুই যুগের দুই তরুণ-প্রজন্ম, কিন্তু তাদের স্লোগান ভিন্ন পথে হলেও লক্ষ্য একই- ‘মানুষের অধিকারের লড়াই।’

এখন প্রশ্ন—আমরা কি এই দুই ইতিহাসকে আলাদা করে দেখব? বরং আমাদের উচিত এগুলোকে এক মহাস্রোতের অংশ ভাবা। কারণ মুক্তিযোদ্ধারা যে বাংলাদেশ তৈরি করে দিয়েছেন- ছাত্ররা আজ সেই বাংলাদেশকে ব্যর্থ হতে দেবে না। তারা আজ প্রমাণ করছে- এই রাষ্ট্র জনগণের, এই পতাকা মানুষের মর্যাদার প্রতীক।

আজকের ঠাকুরগাঁও- উন্নয়ন, ভবিষ্যৎ, শিক্ষা ও কৃষিতে এগিয়ে চলা এক সমৃদ্ধ জনপদ। আর এ অগ্রগতির পেছনে রয়েছে ’৭১ এর বিজয়ের শক্তি। ২০২৪-এর ছাত্র-আন্দোলন যদি গঠনমূলক পরিবর্তনের রাস্তায় নিয়ে আসতে পারে- তবে সেটি হবে ’৭১-এর আত্মত্যাগের প্রকৃত সম্মান।

আমরা ইতিহাসের দীর্ঘপথে দাঁড়িয়ে আমরা বুঝতে পারি- ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযোদ্ধাদের পদচিহ্ন যেমন মুক্তির প্রতীক, তেমনি ২০২৪-এর ছাত্র-যুবাদের পদচিহ্ন ন্যায়ের শিকড়। ’৭১-এর বীরেরা অস্ত্র তুলে নিয়েছিল, ’২৪-এর তরুণেরা তুলেছে কণ্ঠ ও যুক্তি। কিন্তু লড়াই এক- স্বাধীনতার মর্যাদার লড়াই।

এই কারণেই লিখতে পারি- ঠাকুরগাঁওয়ের ধুলো-মাটিতে যে ত্যাগ বোনা হয়েছিল, সেটির ফুল ফুটছে আজও দেশের তরুণ-যুবকের প্রতিবাদী চেতনা হয়ে। আর তাই স্বাধীনতার পতাকা আমাদের মাথার ওপরে একইভাবে উড়ছে অতীতের রক্তস্মৃতিতে, বর্তমানের সংগ্রামী স্লোগানে, আর ভবিষ্যতের স্বপ্নবুননে।

ইতিহাস বলছে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা এবং ২০২৪ ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আমাদের প্রাপ্য ছিল, কিন্তু বিনামূল্যে নয়। ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ সেই মূল্য দিয়েছে রক্তে, অশ্রুতে, মৃত্যুঝুঁকিতে এবং অদম্য সাহসে। আর সেই কারণেই এই ভূমিতে আজ আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি। বলতে পারি- আমরা স্বাধীন, আমরা মুক্ত, আমরা গর্বিত বাংলাদেশি।

লেখক : যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক, জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি)