ট্রান্সজেন্ডাররা করুণা নয়, অধিকার চায়

এক.

আমরা রাস্তা-ঘাটে বা কোন মার্কেটে কোন তৃতীয় লিঙ্গ বা কোন ট্রেন জেন্ডার লোকদের সাথে দেখা হলে অনেকেই ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেই। কেউবা ওদেরকে সরে যেতে বলি। অথবা আমরা ওদের কাছ থেকে দূরে চলে গিয়ে যেন বাঁচি। কেউবা আবার বিরক্তিও প্রকাশ করি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে টাকা চেয়ে বা জোর করে আদায় করে জীবিকা নির্বাহ করতে দেখা যায় তৃতীয় লিঙ্গের লোকজনের। এমনকি কি কিছু তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের মধ্যে অভ্যাসগত অপরাধী আছে যারা নানা রকম কু-কর্মে অভ্যস্ত, ফলে তৃতীয় লিঙ্গের লোকজনের প্রতি সাধারণ মানুষের অবহেলা ও বৈষম্য লক্ষণীয়।

এই বৈষম্য দূর করতে ও সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে নভেম্বরে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার। ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি হিজড়াদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে প্রায় ১২টি বছর। দীর্ঘ এই সময় পেরিয়ে গেলেও তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি তাদের জীবনের কোন উন্নতি লক্ষ্য  করা যাচ্ছে না। স্বীকৃতির পর সরকার শুধু মাসিক ৬০০ টাকা করে ভাতা দিচ্ছে যাদের বয়স ৫০ এবং এর অধিক যা তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। তাদের একটি সংগঠন ‘সুস্থ্ জীবন’- এর প্রধানের মতে তাদের অনেক দাবি-দাওয়া আছে সরকারের কাছে।

 যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা চাইছেন তৃতীয় লিঙ্গের এক ব্যক্তি

সরকার তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন সময়ে সরকার, এনজিওসহ বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে ডাকা হয়, আলোচনা করা হয় কীভাবে হিজড়াদের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা যায়, তা নিয়ে কথা হয় কিন্ত অগ্রগতি নেই ।

ঢাকার হাতিরঝিল এলাকায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের একটি কমিউনিটি হল আছে। সেখানে এলাকার তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ প্রতিদিন সমবেত হন, আড্ডা দেন এবং সারাদিনের কর্মপরিকল্পনা ঠিক করেন কে কোন এলাকায় চাঁদা তুলতে যাবেন ইত্যাদি এখানে নির্ধারণ করা হয়। তাদের একজন সর্দারনি আছেন। তিনি কিছুদিন পরপর এখানে আসেন এবং বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিয়ে যান।

 

ট্রাফিক পুলিশে ট্রান্সজেন্ডার

২০১৫ সালের ১৯ মে সচিবালয়ে বিগত সরকারের এক বৈঠকের সিদ্ধান্তে বলা হয়, ‘পুনর্বাসনের লক্ষ্যে আগামী বছর (২০১৬) থেকে ট্রাফিক পুলিশ হিসেবে হিজড়াদের নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।’ এই ঘোষণার পরও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ করা যায়নি।

 

সেনাবাহিনীতে ট্রান্সজেন্ডার

ইউক্রেনে সেনাবাহিনীতে ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়োগ দেওয়া হয়।তারা খুব দক্ষতার সাথে কাজ করছেন। কারণ তাদের কোন পিছু টান নেই। বাংলাদেশও এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে। সামরিক বাহিনী,  ট্রাফিক পুলিশ, আনসার ও বর্ডার গার্ড (বিজিবি)তে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের কর্মসংস্থান  হলে তাদের দ্বারা সৃষ্ট সামাজিক অস্থিরতা বন্ধ হবে। হিজড়াদেরও সরকারের উপর আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে।

ট্রান্সজেন্ডাররা উন্নয়নে সক্রিয়

তৃতীয় লিঙ্গের অনেক লোকজনের তাদের নিয়ে সরকারি/বেসরকারি  কর্মসূচির বিষয়ে কোনো ধারণা নেই। তবে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি বিষয়ে অনেকের জানা থাকলেও অধিকার ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সেভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। তারা বলছেন, স্বীকৃতির চার বছর পর তারা শুধু স্মার্টকার্ড পেয়েছেন। নিজস্ব পরিচয়ে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারছেন। কিন্তু এতে ভাগ্যের কোন পরিবর্তন মিলেনি। আগেও তারা মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে টাকা তুলে জীবিকা নির্বাহ করেছেন, এখনও সেটাই করছেন।

 

ট্রান্সজেন্ডার কর্তৃক অপরাধ

গত ১৩ আগস্ট ২০২২ বাংলা নিউজ ২৪-এ রাজিব সরকারের লেখা একটি সংবাদ মাধ্যমে জানা যায়, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কোনাবাড়ি থানাধীন বাইশমাইল মধ্যপাড়া বাঁশতলা হিজড়া পট্টির হিজড়াদের বসবাস। এখানে কিছু অভ্যাসগত অপরাধী হিজড়ার একটি সিন্ডিকেট রয়েছে যারা সুস্থ্যমানুষকে না না প্রলোভন দেখিয়ে সার্জারি করে হিজড়া বানায়।

জানা যায়, গত ১০ বছর আগেও সমাজের সবার মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন আসাদুল। তার মধ্যে ছিল মেয়েলি ভাব। তখন তিনি আশুলিয়ায় একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। হঠাৎ হিজড়াদের প্রলোভনে সার্জারি করে ছেলে থেকে হিজড়া বানানো হয় আসাদুলকে। লিঙ্গ পরিবর্তনের মাধ্যমে আসাদুল হয়ে যান টাপুর। টাঙ্গাইলের মধুপুর থানা এলাকার আসাদুল ওরফে টাপুর এভাবেই তার হিজড়া হওয়ার গল্প বলেন। তিনি এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। বাবু ওরফে কাজল ও শহীদ হিজড়া সিন্ডিকেট প্রলোভন এবং ভয়-ভীতি দেখিয়ে আসাদুলের মতো আরও অনেক ছেলেকেই লিঙ্গ পরিবর্তন করে হিজড়া বানিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আকুতি জানিয়েছেন।

বাইমাইল মধ্যপাড়া বাঁশতলা হিজড়া পট্টির হিজড়ারা জানান, বাবু ওরফে কাজল, শহীদ, মৌসুমী, লতা ও আপন তারা সবাই হিজড়া। তারা হিজড়াদের সরদার। তাদের রয়েছে ছেলে থেকে হিজড়া বানানোর ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেট। গত কয়েক বছরে ৩০ থেকে ৪০ জন ছেলেকে হিজড়াতে রূপান্তরিত করে এ সিন্ডিকেট। মেয়েলি স্বভাবের ও দেহের গঠন মেয়েলি, চলাফেরাও মেয়েদের মতো এমন ছেলেদের টার্গেট করে টাকার লোভ ও ভয়-ভীতি দেখিয়ে অপারেশনের মাধ্যমে হিজড়া বানায় ওই সিন্ডিকেট। ছোটবেলায় তাদের রাখা নামও পরিবর্তন করে দেয় এ সিন্ডিকেট। পরে তারা বাবা-মা ও স্বজনদের সঙ্গেও যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। প্রলোভন ও ভয়ভীতির শিকার হয়ে তারা সব ফেলে পাড়ি জমায় অন্য এক জগতে।

 

 

দুই.

জাতিসংঘ স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থা এই লিঙ্গগত ইস্যুগুলোকে ‘যৌন স্বাস্থ্য’ বিষয়ক চ্যাপ্টারে অন্তর্ভুক্ত করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা এখন বোঝা যাচ্ছে হিজড়া আসলেই কোন মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক না। আইসিডি-১১ নামে পরিচিত সবশেষ ম্যানুয়াল গ্রন্থটিতে লিঙ্গের অসামঞ্জস্যতাকে কোন ব্যক্তির লৈঙ্গিক অভিজ্ঞতা এবং লৈঙ্গিক পরিচয়ের অসামঞ্জস্যতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আগের ভার্সন আইসিডি-১০ এ মানসিক এবং আচরণগত ব্যাধি নামক চ্যাপ্টারে ট্রান্সজেন্ডারকে লিঙ্গ নির্ধারণ ব্যাধি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। ডব্লিউএইচও এর একজন প্রজনন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. লালে শে বলছেন, ‘এটা মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাধির আওতা থেকে তুলে নেয়া হয়েছে কারণ আমাদের একটা ভালো বোঝার জায়গা তৈরি হয়েছে যে সেটা (হিজড়া) আসলে কোন মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা না। এটা এভাবেই রেখে দেওয়ায় আগে স্টিগমা তৈরি হচ্ছিল। তাই এই স্টিগমা দূর করার জন্য এবং একই সাথে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা দেয়ার জন্য এটা ভিন্ন একটা চ্যাপ্টারে স্থান দেয়া হয়েছে।

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ যারা বাংলাদেশে হিজড়া নামে পরিচিত, তারা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র, সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থায় পিছিয়ে রয়েছে। ফলে তারা যেমন বঞ্চনা, নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে, ঠিক তেমনি অপরাধমূলক নানা কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ারও প্রবণতা বেড়ে চলেছে তাদের মধ্যে। ফলস্বরূপ ভুক্তভোগী হচ্ছে সমাজের অনেকেই। মানবাধিকারের মৌলিক নীতিতে, প্রতিটি মানুষের শিক্ষা, সম্মান ও জীবনমান উন্নয়নের সমান সুযোগ থাকার কথা, যেখানে বৈষম্যের সুযোগ নেই। অথচ বর্তমান বাস্তবতায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হয়। এ ক্ষেত্রে সব থেকে বাস্তব সন্মত ভূমিকা রাখতে পারে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ।২০১৮ সালে বাউবির ওপেন স্কুল কমনওয়েলথ অব লার্নিংয়ের সহায়তায় ‘জেন্ডার মেইনস্ট্রিমিং ও জেন্ডার পলিসি উন্নয়ন’ শীর্ষক কর্মশালা আয়োজন করেছিল।এর মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে জেন্ডার-সংবেদনশীলতা গড়ে তোলার একটি নীতিগত কাঠামো তৈরি হয়। এই নীতিমালায় সরাসরি তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তির সুযোগ রয়েছে ‘আদার্স ক্যাটাগরি’ হিসেবে।তবে এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও প্রশ্ন উঠেছে- এই স্বীকৃতি বাস্তব ক্ষেত্রে এমন কী পরিবর্তন এনেছে?

স্বীকৃতি প্রদানের সময় বলা হয়েছিল, হিজড়াদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার মাধ্যমে যোগ্য করে তোলা হবে এবং সেই অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।  দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠানটির ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং ৬০টিরও বেশি সক্রিয় উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ পাঠ্যক্রম, কারিগরি প্রশিক্ষণ, বাস্তবমুখী শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারে। তাই বাউবির ওপেন অ্যান্ড ডিস্ট্যান্স লার্নিং মডেল একটি বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থা হিসাবে স্বীকৃতি পেতে পারে। তাছাড়া সরকারি উপ আনুস্থানিক শিক্ষা কার্যক্রমের সাথে তাদেরকে সম্পৃক্ত করা সম্ভব ।

পরিচয় এবং ভূমিকা রয়েছে ট্রান্সজেন্ডারা দীর্ঘকাল ধরে ফার্স্ট নেশনস সম্প্রদায়ের একটি অংশ ছিল এবং এই পরিচয়গুলো লিঙ্গ সম্পর্কে গভীর এবং বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতিফলন। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে যখন সাধারণ মানুষ জানতো না তখন তাদেরকে অনেকে বলত তারা অভ্যাসগত অপরাধী।

 

 

 

প্রিয়ার স্বপ্নপূরণ

তিন.

 

একটিটি স্টল পরিচালনাকারী প্রথম হিজড়া নারী প্রিয়া খানের জীবনের গল্প বদলে দিয়েছে। ক্যাম্পাস থেকে অননুমোদিত বিক্রেতাদের বিতাড়ণের জন্য সাম্প্রতিক অভিযানের পরে, তার স্টলটি ১১টির মধ্যে রয়েছে। যারা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে টিএসসি প্রাঙ্গণে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছে। প্রায়শই গ্রাহকদের ভিড়ে, স্টলটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তাকে এক মুহূর্ত অলসভাবে বসতে দেখা যায় না।

এলাকার অন্যান্য চায়ের স্টলের মতো, তার মেনুতে লেবু চা, মাল্টা চা এবং মাল্টোভা চাসহ বিভিন্ন স্বাদের চা রয়েছে। তিনি কফি চা, মশলাদার চা এবং তেঁতুল চা-এর মতো নতুন স্বাদেরও প্রবর্তন করেন, যা কিছু গ্রাহক বিশ্বাস করেন যে সাধারণের চেয়ে বেশি।

তার দোকানে কেক, বিস্কুট, পাউরুটি এবং কলা বিভিন্ন ধরনের বিক্রি হয়। যা গ্রাহকদের জন্য এটি একটি জনপ্রিয় টি স্টলে পরিণত করে। সেখানে সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করেন তিনি। নিজেকে টিএসসির সামাজিক কাঠামোর সাথে একীভূত করেছেন। শিক্ষার্থীদের সাথে অর্থপূর্ণ কথোপকথনে জড়িত। তাদের দৈনন্দিন অবসরের একটি লালিত অংশ হয়ে উঠেছেন। তবে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের দিকে তার যাত্রা একাকী নয়। তিনি অন্য এক ট্রান্সজেন্ডার মহিলা নদীকে সাহায্য করেছেন। তার কর্মসংস্থান এবং উদ্দেশ্যের বোধের প্রস্তাব দিয়েছেন। যিনি আগে ভিক্ষার মাধ্যমে তার জীবিকা অর্জন করেছিলেন। সাকিব নামে এক যুবক তাদের স্টল পরিচালনায় সহায়তা করছে। তার চায়ের স্টল স্থাপনের আগে প্রিয়াকে টিএসসিতে অনুদানের উপর নির্ভর করতে হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ২০১৬ সাল থেকে তিনি একটি সাবলম্বী জীবন তৈরি করার জন্য দৃঢ়ভাবে চেষ্টা করছেন, যখন তিনি নাচ এবং সঙ্গীত পরিবেশনার মাধ্যমে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে শুরু করেছিলেন।

প্রিয়ার জীবনে একটি সংজ্ঞায়িত মুহূর্ত এসেছিল জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের সময়। যখন তিনি এবং তার চারজন শিষ্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসার জন্য স্বেচ্ছায় কাজ করেছিলেন। বাংলাদেশের ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায় সম্পর্কে তার চিন্তাভাবনা শেয়ার করতে চাওয়া হলে, প্রিয়া বলেন, ‘আমরা আর প্রান্তিক গোষ্ঠী হিসাবে ক্ষান্ত হব না। আমরা সবার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াবো এবং একটি উন্নত ভবিষ্যত গড়তে অবদান রাখব।’

ক্ষমতায়নের দিকে তার অগ্রগতি সত্ত্বেও- প্রিয়া  এখনও সামাজিক নিষ্ঠুরতা থেকে মুক্ত নয়। তিনি অকপটে স্বীকার করেন, ‘আমি এখনও ধমকের সম্মুখীন হই এবং আমি চাই এর হাত থেকে মুক্ত হতে।’

তৃতীয় লিঙ্গ মাদ্রাসা

ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের লোহার ব্রিজ এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে তৃতীয় লিঙ্গ মাদ্রাসা। ঢাকার বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, সিলেট বাজার ও কামরাঙ্গীরচর এলাকার দেড় শতাধিক তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ এই কওমি মাদ্রসায় ভর্তি হয়েছে।শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য দশজন শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

 

সিলেটে‘ ট্রান্সজেন্ডারদের  জন্য স্কুল অব হিউম্যান্স

 

যদিও শিক্ষা সবার মৌলিক অধিকার, সমাজের মূলধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে হিজড়া জনগোষ্ঠীর পড়াশোনার সুবিধা নেই বললেই চলে। থাকলেও সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিজড়া জনগোষ্ঠী স্টিগমা ও সামাজিক কুসংস্কারজনিত কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এই মানুষগুলোকে সেজন্য জীবিকার তাগিদে বেছে নিতে হয় অন্যকোনো পথ। নিজেকে প্রকৃতভাবে জানার জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বিভিন্ন বাধাবিপত্তির কারনে হয়তো আগ্রহ থাকা স্বত্তেও তাদের স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তাদের সেই স্বপ্নকে পূরণ করতে সোশ্যাল এসোসিয়েশন ফর ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (সাদা) এবং সিলেট হিজড়া বাউল সংগঠন যৌথভাবে বাংলাদেশে এই প্রথম শুরু করতে যাচ্ছে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘স্কুল অব হিউম্যান্স’।

 

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য মসজিদ নির্মাণ

ময়মনসিঙ্গে দক্ষিণ চর কালি বাড়ি এলাকায় স্থানীয় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের নামাজ পড়ার জন্য একটি মসজিদ তৈরি করা হয়েছে। যাতে করে তারা স্বাধীনভাবে নামাজ আদায় করতে পারেন। এলাকায় বসবাসকারী ১২জন হিজড়া এই মসজিদ তৈরিতে অর্থ ও শ্রম দিয়েছেন।

 

ট্রান্সজেন্ডাররা কবর স্থান নির্মাণে ১১ শতক জায়গা পেলেন

 

পুলিশ সুপার ও তার স্ত্রী নিজস্ব অর্থায়নে শেরপুর সদর উপজেলার কামারিয়া ইউনিয়নের আন্ধারিয়া-সুতিরপাড় এলাকায় ১১ শতক জমি কিনে কবরস্থানটি নির্মাণ করেন। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। পুলিশ সুপার মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘কবরস্থান নির্মাণের মাধ্যমে আমি কেবল একটি মানবিক কাজে সামিল হতে পেরেছি। আমি বিশ্বাস করি সবার ভালোবাসায় একদিন হিজড়ারা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে, সমাজের অন্যান্য মানুষের সঙ্গে একই মর্যাদায় বাঁচতে পারবে।’

তিনি আরও বলেন, যেখানেই থাকি না কেন, শেরপুরের হিজড়াদের প্রতি আমাদের সহমর্মিতা অব্যাহত থাকবে। এ সময় তিনি এখানকার হিজড়াদের কারও মৃত্যু হলে তাকে জানানো হলে লাশ দাফনের সব ব্যয় বহন করারও ঘোষণা দেন।

শেরপুর জেলা হিজড়া কল্যাণ সমিতির সভাপতি নিশি সরকার বলেন, ‘আমরা পুলিশ সুপার এবং তার সহধর্মিণীর প্রতি কৃতজ্ঞ। মৃত্যুর পর আমাদের মরদেহ দাফনের জন্য কবরস্থান নির্মাণ লাশ দাফনের দায়িত্ব নেওয়ায় তাদের কাছে চির ঋণী হয়ে গেলাম।’ উল্লেখ্য, যে তৃতীয় লিঙ্গের কোন ব্যক্তি মারা গেলে কবর স্থান পায় না তাই তারা

বিভিন্ন সংস্থ্া বা ব্যক্তির কাছে হাত পাততে হয়,তাহাড়া বাসে উটলে নামিয়ে দেওয়া হয়, বাসের কোন সিট পাওয়া গেলে যদি বসেন তখন পাশের যাত্রীরা একে একে সবাই সিট ছেঁড়ে দেন।

 

হিজড়াদের উন্নয়নে কিছু ধারণা

 

দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলাতে ছড়িয়ে থাকা হিজড়াদের একটি নিদ্রিস্ত এলাকায় বাসস্থানের ব্যবস্থা করে তাদেরকে বাস্তবমুখী কারিগরি শিক্ষা প্রদান করে একটি মূলধন দিয়ে স্বাবলম্বী করার ব্যবস্থা করা যাবে। তাদের মধ্যে যারা রূপান্তরিত হতে চান তাদের সয়াহতা করা প্রয়োজন। তবে হিজড়া বানানোর সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করে উপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তাদেরকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতে সহযোগিতা করা ও অগ্রাধিকার দেওয়া।

আরও দরকার, ২০১৬ সালে গৃহীত হিজড়াদের ট্রাফিক পুলিশে নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা। যে এলাকায় এদের উপস্থিতি বেশি সেই এলাকায় একটি হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করা। এই ব্যাপারে সংসদে তাদের সুরক্ষা সম্পর্কিত আইন পাশ করা। তাদের জন্য সংসদে সংরক্ষিত ৫০ জন মহিলাদের মধ্যে একজন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিকে একটি পদ দিলে সংসদে তাদের সম্প্রদায়ের সমস্যার কথা বলতে পারবেন। তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য পাঠ্য পুস্তকে একাটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা।

চার.

আমরা সরকারের কাছে হিজড়াদের সুরক্ষায় কার্যকর সহযোগিতা কামনা করি। সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া সত্ত্বেও হিজড়া জনগোষ্ঠী আজও নানা ধরনের বৈষম্য, অবহেলা ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে। ফলে জীবিকার তাগিদে তাদের অনেককে অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে চলতে হয়।

রাষ্ট্র যদি সত্যিকার অর্থে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে চায়, তবে হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তাদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় এনে স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসনের সুযোগও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- সমাজে তাদের প্রতি বিদ্যমান নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় হয়ে হিজড়াদের ওপর নির্যাতন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

মানবিক ও ন্যায্য সমাজ গড়তে হলে হিজড়া জনগোষ্ঠীর মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। সরকার ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগেই তাদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করা সম্ভব।

 

 মতিলাল দেব রায়, কলাম লেখক ও সমাজ সংগঠক