বঙ্গাব্দের ইতিহাস এবং আজকের বাংলা নববর্ষ উদযাপন উভয়েই একই সুতোয় বাঁধা ঘটনা। পহেলা বৈশাখ কেবল একটি নতুন বছরের সূচনা নয়, এটি সময় মাপার এক অনন্য বাঙালি পদ্ধতির ধারাবাহিকতা, কৃষিজীবনের ঘ্রাণ, শাসনব্যবস্থা ও সংস্কৃতির মিলন এবং রাষ্ট্রনীতি ও লোকজ ঐতিহ্যের এক অপার এবং সম্মিলিত সংযোগ। সম্রাট আকবরের হাত ধরে যে ফসলি সনের সূচনা হয়েছিল, সেই একই বর্ষ আজ পহেলা বৈশাখের রূপে উদযাপিত হয়, বাংলাদেশ থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। বঙ্গাব্দের জন্ম কোনো উৎসবের রঙে হয়নি বরং রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এবং প্রজার কষ্টের সুরাহা করার তাগিদেই হয়েছিল। সম্রাট আকবরের সময়কালে কৃষি অর্থনীতি ছিল সাম্রাজ্যের মূল স্তম্ভ। হিজরি সন চন্দ্রভিত্তিক হওয়ায় ফসল কাটার সময়ের সঙ্গে খাজনা আদায়ের দিন মিলত না। ফলে কৃষকের জন্য সেই সময়ে খাজনা দেওয়া ছিল অতিব কষ্টের।
ইতিহাসের পাঠ থেকে জানা যায়, সম্রাট আকবর কৃষকের এই দুরবস্থা বুঝতে পারেন এবং উপলব্ধি করেন একটি স্থিতিশীল সৌরবর্ষ ছাড়া রাজস্ব ব্যবস্থা সুষ্ঠু হাওয়া বেশ কঠিন। তাই ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি তার রাজজ্যোতির্বিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজিকে নির্দেশ দেন একটি নতুন ক্যালেন্ডার তৈরির। সিরাজি হিন্দু সৌরবর্ষের সূর্যসিদ্ধান্ত, ইসলামিক হিজরি সন এবং আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দকে মিলিয়ে ফতেহউল্লাহ তৈরি করেন ফসলি সন। এই সনের শুরু হয় পহেলা বৈশাখ থেকে, কারণ সেই বছর হিজরি মহরমের সঙ্গে বৈশাখ মাস মিলে গিয়েছিল। এভাবেই জন্ম নেয় বঙ্গাব্দ, যা পরবর্তীকালে বাংলা সাল নামে পরিচিত হয়। প্রথমে এটি ছিল রাজস্ব সংগ্রহের হাতিয়ার, কিন্তু ধীরে ধীরে এটি বাঙালির জীবনের সঙ্গে মিশে যায় ওতপ্রোতভাবে। এই সংস্কারের পেছনে আকবরের ছিল অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকলকে একই জায়গায় এনে মেলবন্ধন তৈরি করার দূরদর্শী চিন্তাভাবনা।
পূর্ববাংলায় পাকিস্তানি শাসকদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ছায়ানট ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে প্রথম পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান করে। এটি ছিল প্রতিরোধের প্রতীক। স্বাধীন বাংলাদেশে এই উৎসব জাতীয় ছুটির দিনে পরিণত হয়। ১৯৮৭ সাল থেকে বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ নির্দিষ্টভাবে ১৪ এপ্রিল পালিত হয়ে আসছে। আজকের সময় দাঁড়িয়ে এই দিনটি লোকগান, মঙ্গল শোভাযাত্রা, গ্রামীণ মেলা, পান্তা-ইলিশের রীতি সবকিছু মিলে এটি হয়ে ওঠে বাঙালির সর্বস্তরের মানুষের উৎসব এবং ধর্মনিরপেক্ষ মিলনমেলা। এই নববর্ষকে কেন্দ্র করে মঙ্গল শোভাযাত্রার রয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। ইউনেস্কো একে মানবজাতির অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়। এর মাধ্যমে বৈশাখ কেবল একটি জাতীয় উৎসব নয়, এটি বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হয়। বাংলার গ্রামীণ আচার ও নাগরিক শিল্পরূপের এই মেলবন্ধন বিশ্বমঞ্চে বাঙালির পরিচয়কে করেছে আরও উজ্জ্বল এবং সমৃদ্ধ।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে বঙ্গাব্দকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও সুসংহত করা হয়। তারিখ নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক সংশোধনও আনা হয়, যাতে ঋতুচক্রের সঙ্গে সঙ্গতি বজায় থাকে। এই সংস্কারের ফলে আজকের বাংলা ক্যালেন্ডার আরও স্থিতিশীল ও ব্যবহারিক হয়েছে। ফলে কৃষি, শিক্ষা, প্রশাসন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সব ক্ষেত্রে বঙ্গাব্দের ব্যবহার সুসংহত রূপ পেয়েছে। মূলত এই সন এক দীর্ঘ রূপান্তরের দলিল। আকবরের প্রশাসনিক প্রয়োজন থেকে শুরু করে কৃষকের ক্যালেন্ডার, ব্যবসায়ীর হিসাবের খাতা থেকে শিল্পীর ক্যানভাস এবং সর্বসাকুল্যে জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়েছে। বৈশাখ আজ শহরের রাস্তায় শোভাযাত্রা, গ্রামের মেলায় নাগরদোলা, ঘরের পান্তাভাতে পারিবারিক মিলন, রঙিন পোশাকে নতুন প্রভাতের সূচনা। মূলত বঙ্গাব্দের প্রাণশক্তি তার অভিযোজন ক্ষমতায়। এটি সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলেছে, তবু মূলধারা অক্ষুণ্ন রেখেছে। বৈশাখ আমাদের শেখায় সময় কেবল ঘড়ির কাঁটায় নয়, সময় মাপা হয় মানুষের জীবনযাত্রা, প্রকৃতির পরিবর্তন, সমাজের বিবর্তনের ভেতর দিয়ে। বঙ্গাব্দ সেই জীবন্ত সময়পরিমাপ, যা বাংলার মানুষকে তার মাটির সঙ্গে, ইতিহাসের সঙ্গে, সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রেখেছে অনন্তকাল ধরে। পাশাপাশি বজায় রেখেছে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ভিত্তি। আধুনিক যুগে এসে বৈশাখ পালনের ধরন বদলেছে এবং এতে করপোরেট সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছে কিন্তু এর মূল চেতনাটি এখনও গ্রামীণ জনপদ থেকে নগরের অলিগলি পর্যন্ত প্রবহমান।
পহেলা বৈশাখ মানে কেবল উৎসব নয় বরং এটি আত্মপরিচয় রক্ষার সমন্বিত শপথ। আজকের প্রজন্ম যখন পহেলা বৈশাখে রঙিন শোভাযাত্রা করে, গান করছ, নতুন পোশাক পরে, মূলত তারা অজান্তেই বহন করে পাঁচশ বছরেরও বেশি পুরনো এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। এ কথা সত্য যে, পৃথিবীর মানচিত্রে যে জাতিগুলো নিজেদের স্বকীয়তা ও আত্মমর্যাদা নিয়ে সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের প্রত্যেকেই আন্তর্জাতিক যোগাযোগের পাশাপাশি নিজস্ব বর্ষপঞ্জিকাকে পরম মমতায় লালন করে। নিজস্ব বর্ষপঞ্জি শুধু দিন গোনার মাধ্যম নয়, এটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান বাহন। চীন, জাপান থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়—দৈনন্দিন জীবন, জাতীয় উৎসব কিংবা সামাজিক রীতিনীতিতে তারা নিজেদের দিনপঞ্জির ওপরই সর্বাধিক নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রয়োজনে তারা গ্রেগরিয়ান বা ইংরেজি ক্যালেন্ডার ব্যবহার করলেও, শেকড়ের পরিচায়ক নিজস্ব বর্ষপঞ্জিকে তারা কখনোই অবহেলা করেনি। অথচ, যে বাঙালি জাতি ভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢেলে দিয়েছে, সংস্কৃতি রক্ষার আন্দোলনে যারা যুগে যুগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে, সেই আমাদের কাছেই আমাদের নিজস্ব ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা বর্ষপঞ্জিকা আজ চরম অবহেলার শিকার। আমাদের এই আত্মবিস্মৃতি সত্যিই গভীর বেদনার।
সমাজের বর্তমান চিত্র পর্যবেক্ষণ করলে এই অবহেলার মাত্রাটি মর্মান্তিকভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেশের যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি অফিস-আদালত, ব্যাংক-বিমা, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তন্ন তন্ন করে খুঁজলেও একটি স্বতন্ত্র বাংলা বর্ষপঞ্জিকা চোখে পড়ে না। চারপাশের দেয়ালে শোভা পায় চকচকে ইংরেজি ক্যালেন্ডার। সেখানে হয়তো এক কোণে অত্যন্ত ক্ষুদ্র অক্ষরে বাংলা তারিখটি লেখা থাকে, যা কারও নজরেই আসে না। অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, আজকাল বাণিজ্যিকভাবে শুধু বাংলা মাসের হিসাব সংবলিত ক্যালেন্ডার ছাপানোর কোনো উদ্যোগও চোখে পড়ে না। এর কারণ একটাই, আমরা সামাজিকভাবে এর কোনো চাহিদাই তৈরি করতে পারিনি। সবচেয়ে লজ্জার বিষয় হলো, বর্তমান প্রজন্মের বেশিরভাগ বাঙালিকে, এমনকি অনেক শিক্ষিত জনকেও যদি হুট করে বাংলা বারোটি মাসের নাম ধারাবাহিকভাবে বলতে বলা হয়, তারা হোঁচট খাবেন। কোন মাসে কত দিন বা আজকের বাংলা তারিখ কত, সেটি জানতে চাইলেও স্মার্টফোন বের করে খুঁজতে হয়।
মানতেই হবে, আমাদের জীবনের সব আনন্দ-আয়োজন এখন পুরোপুরি ইংরেজি ক্যালেন্ডার-নির্ভর। অথচ আমাদের এই বাংলা বর্ষপঞ্জির রয়েছে সুদীর্ঘ, সমৃদ্ধ এবং অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত এক ইতিহাস। ভারতবর্ষে মুঘল শাসনামলে হিজরি চন্দ্রবর্ষ ও সৌরবর্ষের মধ্যে দিনগণনার পার্থক্যের কারণে কৃষকদের কাছ থেকে কৃষি মাশুল বা খাজনা আদায়ে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিত। এই সমস্যা সমাধানে সম্রাট আকবরের নির্দেশে রাজজ্যোতিষী আমির ফতেহুল্লাহ শিরাজির ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ‘তারিখ-ই-এলাহি’ বা ‘ফসলি সন’ প্রবর্তন করা হয়, যা পরবর্তীকালে বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। অর্থাৎ, এই বর্ষপঞ্জিকার জন্মই হয়েছিল এ দেশের মাটি, মানুষ, কৃষি ও আবহাওয়ার সঙ্গে নিবিড় সামঞ্জস্য রেখে। আমাদের ষড়ঋতুর এই বদ্বীপে প্রকৃতির পালাবদলের সাথে বাংলা মাসগুলোর যে নিবিড় ও আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে, তা অন্য কোনো ক্যালেন্ডার দিয়ে অনুভব করা কিছুতেই সম্ভব নয়। কালবৈশাখীর রুদ্ররূপ, বর্ষার কদম ফুল কিংবা অগ্রহায়ণের নবান্নের ঘ্রাণ- এসবই বাংলা বর্ষপঞ্জির নিজস্ব স্পন্দন।
একটি জাতির শেকড় কতটা মজবুত, তা নির্ভর করে তারা নিজেদের ঐতিহ্যকে কতটা গভীরভাবে প্রাত্যহিক জীবনে ধারণ করে তার ওপর। পয়লা বৈশাখে একদিনের জন্য গালে আলপনা এঁকে বা পান্তা-ইলিশ খেয়ে বাঙালি সাজার মাঝে কোনো সত্যিকারের স্বকীয়তা নেই; এটি নিছকই এক দিনের উৎসব। নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি প্রকৃত দায়বদ্ধতা প্রমাণ করতে হলে বাংলা ক্যালেন্ডারকে কেবল নববর্ষের একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এটিকে আমাদের প্রাত্যহিক রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করতে হবে। সরকারি সমস্ত প্রজ্ঞাপন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নোটিশ ও অফিসের কাগজপত্রে ইংরেজি তারিখের পাশাপাশি বাধ্যতামূলকভাবে সমান গুরুত্ব দিয়ে বাংলা তারিখ ব্যবহারের নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করা আজ সময়ের যোগ্য দাবি। ছাপাখানাগুলোকে বাংলা মাসভিত্তিক ক্যালেন্ডার প্রকাশে উৎসাহিত করতে হবে। সংবাদপত্রে এবং বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে এর নিয়মিত চর্চা বাড়াতে হবে, যেন শিশুরা শৈশব থেকেই বাংলা মাস ও ঋতু সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করে। আগামী প্রজন্মের কাছে নিজস্ব বর্ষপঞ্জিকাকে মর্যাদার সাথে তুলে ধরতে না পারলে, আত্মপরিচয়ের সংকটে ভোগা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় থাকবে না।
প্রাইমা হোসাইন, সমাজসেবিকা ও সংগঠক





